চাঁদাবাজদের কাছে শামীম ওসমান অসহায়!

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
বাংলাদেশের আলোচিত যে ক’জন প্রভাবশালী এমপি রয়েছেন তাদের মধ্যে প্রথম সারিতেই আছেন শামীম ওসমান। সেই সাংসদ শামীম ওসমান ফতুল্লায় বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা উঠানোর ঘটনা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নজরে এনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। গত শনিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে শামীম ওসমানের এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজি হচ্ছে। আমি সব সময় সত্য কথা বলি, যেটা অন্যায় যেটা মিথ্যা তার প্রতিবাদ করি। পত্রিকায় যেটা লেখা হয়েছে সেটা সত্য। আমার এলাকায় প্রায় ৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারির অফিসারদের কোয়াটার নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে একটি খেলার মাঠ আছে। মাঠটি সংরক্ষণের অনুরোধ করেছিলাম, সেটি রাখা হয়েছে। খেলার মাঠের জন্য ১২ কোটি টাকা অনুদানও হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ সেখানে যে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছিল সেখানে একটি চাঁদাবাজ গোষ্ঠী চাঁদা আদায় করছে। ওয়াকওয়েটা পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে খেলার মাঠের নাম করে শ্রমিকদের কাছ থেকে এক-দুই টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজি করার লোকের অভাব নেই। ওখানে তিন বছর ধরে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যারা টেন্ডার নিয়েছেন সন্ত্রাসীদের জন্য তারা কাজ করতে পারছে না। সেখানে প্রতিদিন ৪-৫ টাকা লাখ চাঁদা আদায় হয়। আমি নিজেই লজ্জিত। সাংসদ শামীম ওসমানের এ বক্তব্যের পর ফতুল্লা ছাড়িয়ে সমগ্র নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কে এই প্রভাবশালী চাঁদাবাজ? যার বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খরা বাহিনীতো বটেই খোদ সাংসদ শামীম ওসমান অসহায়। কারণ আওয়ামীলীগের দু:সময়ের কান্ডারী হিসাবে পরিচিত সাংসদ শামীম ওসমানের এ বক্তব্যের পর ফতুল্লার সেই প্রভাবশালী চাঁদাবাজকে নিয়ে প্রশাসনও বিব্রত। কারণ একজন সাংসদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এবার নিজেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। তাঁর সেই অসহায়ত্ব প্রকাশ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কারণ শামীম ওসমানের দাবী তাঁর নির্বাচনী এলাকাতে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজী হলেও তিনি কিছুই করতে পারছেন না। কেন সাংসদ শামীম ওসমান এত অসহায় হয়ে পড়লেন এ নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ প্রকাশ্যে চাঁদাবাজ, ভ’মিদস্যু আর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহনের কথা ঘোষনা করার পর ইতি মধ্যে পুলিশ সুপার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নেমেছে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ঝুট সন্ত্রাসীদের তালিকাসহ অপরাধের সাথে জড়িতদের তালিকা প্রনয়ণ করা হচ্ছে। তারপরও একজন সাংসদের এধরণের অসহায়ত্ব নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে নাড়া দিয়েছে। শনিবার জাতীয় সংসদে শামীম ওসমান আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের হাত কতটুকু লম্বা, দাঁত কত শক্ত, তারা এই সাহস পায় কোথা থেকে। সন্ত্রাসীদের এই শক্তির উৎস কোথায়। তারা যত বড় শক্তিশালীই হোক তাদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা নিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। এদিকে শামীম ওসমান কোন চাঁদাবাজের নাম উল্লেখ করেনি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট লাঘব করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্বদিচ্ছায় একটি প্রকল্প হাতে নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় ‘সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য ৮টি ১৫তলা ভবনে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬সালের ২২মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এ অনুমোদন করা হয়। পরের বছর ২৯মার্চ এই প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ শুরু করে সরকার। প্রায় ৪শ ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ, ৪টি খেলার মাঠ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার সহ অনেক কিছুই। জানা গেছে, গত বছরের ৫মে ফতুল্লা পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে শ্রমিক লীগ নেতা পলাশের বিরুদ্ধ জিডি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবি¬উটিএ) ঢাকা বন্দর। এয়াড়াও সরকারী কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনেও গত বছরই পলাশের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় সাধারন ডায়েরী (জিডি) করেন। এছাড়াও ২০১৭সালের ১২নভেম্বর প্রকল্প কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ফতুল্লা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি)। কিন্তু পুলিশ ঐসময় কোন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে নতুন করে প্রকল্পের কাজে বাধা, প্রাণ নাশের হুমকি ও মালামাল লুটের অভিযোগ এনে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে গণপূর্ত বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষে উপ সরকারী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান ২০১৮ সালের ৩ মে ফতুল¬া থানায় অপর একটি সাধারণ ডায়েরী (নং ১১৯) করেন। এরপর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি) এর পক্ষ থেকে পুনরায় ২০১৮সালের ৭আগষ্ট প্রকল্পে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে জিডি করেন। এব্যাপারে গণপূর্তবিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, প্রকল্পের বিরুদ্ধে আলীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ ২য় আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি রীট করা হয়েছিল। ঐ নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তটি আদালত খারিজ করে দেয়। কাউসার আহমেদ পলাশ নিজেই বাদীহয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রীট করেছিলেন ২০১৬সালে। কিন্তু ২০১৭সালের ১৯অক্টোবর ঐরীটটি খারজি করে দেয় হাইকোর্ট। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে মালিক ও শ্রমিকরা জানান, আমরা এই ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালিয়ে কোন রকমে আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করি। অথচ ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে একটি চাঁদাবাজ মহল আমাদের পেটে লাথি মেরে আমাদের পরিবারের হক নষ্ট করে জোড় জুলুম অন্যায় অত্যাচার করে আমাদের ঘাম ঝরানো অর্থ টোকেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজী করে নিয়ে যায়। আমরা বিপদে আপদে পড়লে সড়কে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তারা আমাদের কোন সাহায্য সহযোগিতা করেনা অথচ সাহায্য সহযোগিতার কথা বলে প্রতিদিন আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে আমাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ। ৬ বছর আগে টোকেন বাবদ প্রতি অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। ৪০০ অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে সর্বমোট ২৬ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতি ৩০ টাকা চাঁদা হিসেবে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১২ হাজার টাকা যা মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ৪৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এছাড়া ৩০০ টাকা মাসিক চাঁদা হিসেবে প্রতি মাসে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের কথা বলা হলেও গত ৬ বছরে কেউই কল্যাণ ফান্ডের কোন হিসাব পায়নি। বরং হিসাব চাওয়ায় কমিটির সদস্যদেরকেও লাঞ্ছিত করে কমিটি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কুতুবপুর এলাকায় ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের অনুগামী আজিজুল হক, মজিবর, সালু, সোহাগসহ একটি সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি করে আসছে। এভাবে পঞ্চবটি থেকে পাগলা রুটেও বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি চলে আসছে। আমাদের গরীবের ঘাম ঝরানো এই অর্থ দিয়ে কেউ কেউ রাতারাতি বিশাল অর্থের মালিক হয়ে গেছেন।আমরা আর কোন চাঁদাবাজকে চাঁদা দিতে চাইনা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মহোদয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি অচিরেই যেন আমাদের এই চাঁদা দেয়া বন্ধ হয়। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রভাশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা বালু, পাথর, ইট, সুরকী, কয়লা, গাছের গুড়ি ফেলে ওয়াকওয়ে দখল করে রেখেছে। আবার কোথাও কোথাও রেলিং ভেঙ্গে গাছের গুড়ি গেড়ে বালু ইট সুরকী ফেলে নদী ভরাট করে এবং বাশের খুঁটিগেড়ে জেটি বানিয়ে মালামাল লোড আনলোড করে আসছে। যার কারণে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল । ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, সরকার কর্তৃক নির্মিত ওয়াকওয়ে তারা অন্যায়ভাবে ব্যবহার সঙ্গে ব্যবসার কারণে সেটা ভেঙে ফেলেছে। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে জেলা সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গনে জেলার শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, দাড়ি রেখে টুপি মাথায় দিয়ে চাঁদা তুলবেন, হয় আপনি থাকবেন নয় আমি থাকব। গার্মেন্টস থেকে চাঁদা নিবেন, আবার শ্রমিকদের নিয়ে স্লোগান দিবেন তা হবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, কাউসার আহমেদ পলাশ নিজেকে ফতুল্লার একমাত্র ও অদ্বিতীয় শ্রমিক নেতা মনে করেন। খোদ আদালতে দায়ের করা জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে পলাশ ওই দাবী করেন। তাঁর দাবী, তিনি ফতুল্লার সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রমিক নেতা। শ্রমিক নেতা শব্দটি উচ্চারিত হলেই তাঁকেই প্রথম বোঝানো হয়। পলাশের ছিচকে কয়েকজন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হলেও মূল চাঁদাবাজরা এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে। এ ব্যপারে পুলিশ সুপারের দিকে তাকিয়ে আছে ফতুল্লার বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অটো রিকশা চালকরা। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সাংসদ শামীম ওসমানের হতাশ হওয়ার কিছু নেই অপরাধী যে দলেরই হোক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক তাকে অচিরেই আইনের আওতায় আনা হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *