না’গঞ্জে এক দশকে ২৪ শিক্ষার্থী খুন!

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
নেয়ামুল হক নাঈমের ষাটোর্ধ্বো মা ছেলের পথপানে এখনো চেয়ে থাকেন। চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তে চোখের কোণে ঘাঁ হয়ে গেছে। নাওয়া নেই। খাওয়া নেই। শুধুই বিলাপ। ‘আমার পোতটারে (ছেলে) ক্যান ওরে মাইরা ফালাইলো। বিচারডাও পাইলাম না। হারামীরা বাইর অইয়া আইয়া অহন আরো বেশি কতা কয়। কয় মামলা তুইলা ফালাইবার লেইগ্যা।’ গতকাল বুধবার নাঈমের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এ দৃশ্য। নাঈমের মা তখন ছেলে আসবে এমন অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে। নাঈমের মতো আরো অনেক স্কুল ছাত্র খুনের নিশানার শিকার হয়েছেন। গত এক দশকে রূপগঞ্জে ২৪ স্কুল ছাত্র খুন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি মামলা বছরের পর বছর ঝুঁলে আছে। কোনটা রয়েছে বিচারাধীন। আবার কোনটার মীমাংসাও হয়েছে। ভাল নেই নিহতের শিকার এসব পরিবারগুলো। তবে এরা ভাল না থাকলেও হত্যা মামলার আসামীরা রয়েছে বীরদর্পে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জে হত্যা রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্কুল ছাত্র হত্যার নিশানা বেড়ে গেছে। গত এক দশকে রূপগঞ্জে ২৪ স্কুল ছাত্র খুনের শিকার হয়েছে। থানা পুলিশ, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, রেফারেন্স ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ২০১৩ সালের ১১ মে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের মৃত আমানউল্লার মেয়ে শান্তা মনিকে পিটিয়ে হত্যা করে বখাটেরা। সে ভুলতা স্কুল এন্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীতে পড়তো। একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সিনহা কলেজের ছাত্রী আমেনা বেগম খুনের শিকার হন। ২০১৩ সালের ১৯ এপ্রিল অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মুন্না খুনের শিকার হয়। নাঈম হোসেন। জাঙ্গীর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলা। বিগত ২০১৪ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারী তাকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৪ জুন হত্যার শিকার হন মিঠাব এলাকার দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নেয়ামুল হক নাঈম। ২০১৪ সালে আরেক স্কুল ছাত্র রূপসী নিউ মডেল স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র আল-আমিনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৭ জানুয়ারী বরপা বাগানবাড়ি এলাকায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সুইটি আক্তার হত্যার শিকার হন। ২০১৪ সালের ৩ জুলাই তারাব হাটিপাড়া এলাকার স্কুল ছাত্রী মৌসুমি আক্তারকে হত্যা করা হয়। সে সিনহা স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। ভুলতা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র মারুফ মিয়া ২০১৬ সালের ২৫ আগষ্ট খুনের শিকার হন। একই বছর পরকীয়া প্রেমের জেরে খুনের শিকার হয় কাজীরবাগ এলাকার অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী মুক্তিপণের ৫০ হাজার টাকা না পেয়ে ভুলতা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র তাজুল ইসলামকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। একই বছরের ৪ নভেম্বর আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। আয়েত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রিয়াংকা আক্তারকে গলা কেটে হত্যা করে কতিপয় বখাটে। এ বছরের ২০ সেপ্টেম্বর আব্দুল হক ভূঁইয়া ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এমরান হোসেন নিখোঁজ হয়। আজ অবধি তার সন্ধান মেলেনি। পরিবারের ধারণা, তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৭ মে মুড়াপাড়া কলেজের ছাত্র হোসেন আহম্মেদ রুবেল খুনের শিকার হয়। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারী দেবই কাজীরবাগ আলিম মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী পাপিয়া হত্যার শিকার হয়। একই বছরের ২১ জানুয়ারী খুনের শিকার হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র পারভেজ আহম্মেদ জয়। একই বছরের ৬ জুন শিশুমেলা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র জয়ন্ত চন্দ্র দাস হত্যার শিকার হয়। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারী নবকিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র আসলাম হোসেনকে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারী সলিমউদ্দিন চৌধুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাসির দেওয়ান খুনের শিকার হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ছাত্র হত্যার নেপথ্যে ৪ টি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। রাজনীতির বলি, ত্রিভুজ প্রেমের গল্প, মুক্তিপণ ও পারিবারিক জমি বিরোধ। গত এক দশকে যে ২৪ জন ছাত্রছাত্রী খুনের শিকার হয়েছে এদের একটি খুনেরও বিচার হয়নি। মামলার বোঝা বইতে না পেরে অনেক পরিবার মামলা থেকে সরে এসে মীমাংসার পথ বেছে নিয়েছে। অনেক মামলা বিচারাধীন। আবার স্বাক্ষী প্রমাণের অভাবে দুয়েকটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলায় জামিনে বের হয়ে এসে মামলার আসামীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আয়েশী জীবন কাটাচ্ছে। উল্টো হুমকি আর নির্যাতনের ভয়ে নিহতের পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কথা হয় নিহত পারভেজের পরিবারের সঙ্গে। তারা বলেন, মামলার মতো মামলা চলতেছে। আসামীরা জামিনে এসে ঘুরাফেরা করছে। আমাদের আর কি করার আছে। জাঙ্গীর এলাকার নাঈমের পরিবারের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, আমাগো তরতাজা পোলাডারে মাইরা ফালাইছে। কিছুই অইলো না। আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া ছাড়া কোন উফায় নাই। রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুল হাসান বলেন, আমি নতুন এসেছি। এসব ঘটনা আগের। আমি চেষ্টা করবো যেনো এমন ঘটনা আর না ঘটে। নিহত স্কুল ছাত্রছাত্রীদের পরিবারগুলো যদি কোন সমস্যা মনে করেন জানালে ব্যবস্থা নিবো।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *