বিলীনের পথে ঐতিহাসিক পিঠালীপুল

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

পিঠালীপুল। কোন মহিলা কবে এই পুলের পাশে বসে পিঠা বিক্রি করতো তা কেউ জানে না। আশপাশের বয়বৃদ্ধদের জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে পুলের পাশে বসে মহিলা পিঠা বিক্রি করতো বলে সেই সুবাদে এ স্থানের নামকরণ হয়েছে পিঠালীপুল। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা ইউনিয়নের সস্তাপুর রোড অর্থাৎ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পূর্ব পাশে পিঠালীপুল। সে সময় এ এলাকায় তেমন জনবসতি ছিল না। শীতের সকালে অথবা কুয়াশা ঘেরা বিকালে কোন সে বিধবা মহিলা মাটির চুলায় ভাপা পিঠা বিক্রি করতো তা কে জানে! সে অনেক দিনের পুরনো কথা। বর্তমানে বিরাট জনবসতি গড়ে উঠেছে পিঠালীপুল এলাকায়। শুধু তাই নয় পুলের দুপাশ ঘিরে শিল্প কারখানাও গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারীদের যাতায়াত এই পথে। সকাল থেকে গভীর রাত এমন কি সারারাত যানবাহন চলাচল করে এই সড়কে। পথচারীরা যার যার কর্মস্থলে ব্যস্ততা নিয়ে চলে যায়। কে কার খবর রাখে? আর খবর রেখেই বা কী লাভ! এখন এ পুলের ধারে কেউ পিঠা বিক্রি করে না। আর যে পুলের উপর দিয়ে যাতায়াত করছে। সে পুলের ইতিহাসও কেউ স্মরণ করে না। দীর্ঘদিনের পুরনো ইট শুড়কীর নির্মিত পুলটির দুপাশে বন-জঙ্গলে ভরে গেছে। তবে স্বাভাবিক সড়ক পথের চেয়ে বেশ উচু বিধায় বুঝা যায় পুলের উপর দিয়ে যাচ্ছি। বেশ কদিন আগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গিয়ে ছিলাম কবি সেলিম মিয়ার সাথে দেখা করতে। আমার সাথে ছিল সাংবাদিক রাকিব চৌধুরী শিশির। রিক্সা দিয়ে ফতুল্লা আসার পথে পিঠালীপুলের ধারে রিক্সা থামিয়ে পুরনো পুলটির একটি ছবি তুলে নিলাম। শিশির আমাকে অনেক প্রশ্ন করছিল। চলন্ত রিক্সায় বসে ওর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছিলাম। রিক্সাযোগে যে সড়ক পথ দিয়ে আসছি তার নাম গ্রান্ডট্যাঙ্ক রোড। দাপা পোস্টঅফিস থেকে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সড়ককে সবাই সস্তাপুর উপজেলা সড়ক বলে জানে। পূর্বেই বলেছি এই সড়ক পথের দু’ধারে সবুজ বৃক্ষরাজি, এখন ইটে ঘেরা দালানকোঠা আর পিচ ঢালা পাকা সড়ক পথ। ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যায় ১৬ শতকে সোনারগাঁর সুলতান শেরশাহ তার নিরাপত্তা ও যোগাযোগের লক্ষ্যে সোনারগাঁ থেকে ফতুল্লা দাপা হয়ে গ্রান্ডট্যাঙ্ক রোড নির্মাণ করেন। যা কোলকাতা থেকে ব্যারাকপুর হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিল। সেই আমলের নির্মিত এই ইট শুড়কীর পুল পিঠালীপুল। ঈশা খাঁর আমলে তাঁর সৈন্যরা নদীপথে নিরাপত্তার লক্ষ্যে সোনারগাঁ থেকে দাপা বালুর ঘাটে তাবু পেতে অবস্থান করতো। সে কারণেই এই এলাকার নামকরণ করা হয় দাপা। আর সেই দাপা হতে সস্তাপুর হয়ে হাজীগঞ্জ থেকে ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁ পর্যন্ত রোডটিই হলো গ্রান্ড ট্যাঙ্ক রোড। বর্তমানে সোনারগাঁয়ের বারো ভূঁইয়ার এক ভূঁইয়া ঈশা খাঁ নেই। নেই সেই পিঠাওয়ালী। গ্রান্ড ট্যাঙ্ক রোডে রয়েছে শুধু ছোট্ট ইটের শুড়কির নির্মিত পুল। যার নাম পিঠালীপুল। ইতিহাস বা ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী জাতি হিসেবে আমাদের সুখ্যাতি কোনোকালেই ছিল না। বহু ঐতিহ্যবাহী সৌধ, ভবন, বা শিল্প নিদর্শন অনাদরে হারিয়ে গেছে। তদ্রƒপ, কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার প্রাচীন ও দীর্ঘতম ‘সড়ক এ আজম’ বা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। সুপ্রাচীন এই সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়িলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৩টি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। বাংলাদেশে এই সড়ক শের শাহ সড়ক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হতে ঢাকার সোনারগাঁ হয়ে যশোর হতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ও পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সড়কটি। শের শাহর তত্ত্বাবধানে নির্মিত মোট আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি সেই সময় উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করে এবং প্রধান সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সড়কটি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন জনপদ, নগর ও ব্যবসা কেন্দ্র। শের শাহ এই সড়কের ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির প্রতিষ্ঠা ও সরাইখানা করে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করেন। কালের ¯্রােতে সরাইখানা বিলীন হয়ে গেছে, তেমনি বিলীন হতে চলেছে বাংলাদেশ অংশে সড়কের অস্তিত্ব। উল্লেখ্য, শের শাহ ছিলেন ভারতবর্ষের স¤্রাট ও শুর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। ১৫৩৭ সালে মোগল স¤্রাট হুমায়ুনের সেনানায়ক হিসেবে শের শাহ বাংলা জয় করেন। ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরের শাসনামলে শের শাহ মৌর্য যুগের প্রাচীন সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করিয়া ‘সড়ক এ আজম’ নামকরণ করেন এবং কাবুল হইতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক সুতায় গাঁথিয়া দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সড়কটির নাম পরিবর্তন করে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড রাখা হয়। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে শের শাহর নির্মিত এই সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত যশোরের বেনাপোল হতে ঢাকার সোনারগাঁ হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কের অস্তিত্ব আছে এখন কেবল যশোরের বাঘারপাড়ায়। শের শাহ সড়ক নামে উপজেলার প্রবেশমুখ হতে বিপরীত দিকের শেষ সীমানা পর্যন্ত মাত্র ৩৭ কিলোমিটার বিস্তৃত। বর্তমানে আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে বরাবরই আমরা দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছি। নতুন নির্মাণ আমরা করেছি অনেক, কিন্তু পুরাতনের সঙ্গে সকল সংযোগ রাখতে পারিনি, বরং দূরে ঠেলে দিয়েছি। অথচ ঐতিহ্যের স্মারকগুলি বারবার নবায়নের মাধ্যমেই আধুনিক জীবন শেকড় সংলগ্ন তো বটেই, অধিকতর আধুনিকও হয়ে ওঠে। পুরাতন স্মৃতিগুলি জীবন্ত হয়ে চিন্তা ও মননে নতুন নতুন সাংস্কৃতিক সৃজনে উদ্বুদ্ধ করে। স্বাধীন বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথের বিপুল উন্নতি ঘটেছে। প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ছোট-বড় পাকা সড়কে সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু এশিয়ার দীর্ঘতম এই সড়কের উন্নয়নে কোনো সরকারই কাজ করেননি। অথচ সড়কটির উন্নয়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব ৫০-৬০ কিলোমিটার কমে যেত। আর, সচল থাকলে কেবল যাতায়াতের সুবিধাই হত না, বরং যাতায়াত ও অন্যান্য সূত্রে মানুষের মনে এই জনপদের দীর্ঘ ঐতিহ্যময় ইতিহাসের স্মৃতি উদ্রেক করতে পারতো।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *