পঞ্চবটি থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত বিকল্প সড়ক হলে শহরে চাপ কমবে

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট

বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী নিতাইগঞ্জের পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্রে সকাল থেকে গভীর রাত অবধি চলে লোড আনলোড। যে কারণে নিতাইগঞ্জে সবসময়ই সড়কের উপরেও লোড আনলোড চলার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এদিকে নিতাইগঞ্জের উদ্দেশ্যে আসা ট্রাকগুলো সাধারণত পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনাল থেকে টোকেন নিয়ে আসতে হয় শহরে। চাষাঢ়া হয়ে খানপুর সিরাজদ্দৌলা সড়ক দিয়ে ট্রাক প্রবেশ করে ১নং রেলগেইট হয়ে বাস টার্মিনালের সামনে দিয়ে যেতে হয় খালি ট্রাকগুলোকে। তবে এই পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনাল থেকে নিতাইগঞ্জ যাওয়ার জন্য বিকল্প সড়ক নির্মিত হলে চাপ কমবে শহরের উপরে এমনটিই মনে করছে সচেতন মহল। জানা গেছে, শহরের নিতাইগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারী ব্যবসা কেন্দ্র থেকে চাল, আটা-ময়দা, গম, তেল, চিনি, ডাল, লবনসহ নানা ধরনের নিত্য পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পরে নিতাইগঞ্জকেই দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারী ব্যবসা কেন্দ্র বা মোকাম হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন অনেকে। এই মোকামে আটা-ময়দা, লবন ও ডালের মিল রয়েছে প্রায় দেড়শ’। নিতাইগঞ্জের আটা ময়দার চাহিদা সিলেট, গাজীপুর, সাভার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, উত্তরাঞ্চল সহ বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুরসহ দেশের ৪০ টি জেলায় তেল ও চিনি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। লবনের বড় মিলগুলো যেমন এসিআই, ফ্রেশ, মোল্লা, পূবালীসহ বড় মিলগুলো নারায়ণগঞ্জেই অবস্থিত। দেশের লবনের চাহিদার সিংহভাগই সরবরাহ করা হয়ে থাকে নিতাইগঞ্জ থেকে। নিতাইগঞ্জে অন্তত ৮ হাজার শ্রমিক লোড আনলোডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। নিতাইগঞ্জে লোড আনলোডকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নিতাইগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছিল ট্রাক স্ট্যান্ড। ওয়ান ইলেভেনের পর বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ডটি উচ্ছেদের পরে আবারো বহাল হওয়ার পরে নানান ঘটন অঘটনে আলোচিত ছিল ট্রাকস্ট্যান্ডটি। বিশেষ করে নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ডটি উচ্ছেদ নিয়ে বরাবরই সোচ্চার থাকা মেয়র আইভীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ছিল আলোচিত। মন্ডলপাড়া থেকে নিতাইগঞ্জসহ বৈধ স্ট্যান্ডের বাইরে অসংখ্য ট্রাক স্ট্যান্ড উচ্ছেদে ২০১৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর নাসিক প্রশাসনকে চিঠি দেয়া দেয়। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের নোটিসের জবাব না দেয়ায় হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) এলাকায় গড়ে উঠা অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ড ১০ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এই নির্দেশনা কার্যকর করতে বলেন হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাজেট অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় এমপি সেলিম ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শহরের নিতাইগঞ্জে ট্রাক স্ট্যান্ড উঠানো ও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার দাবী করেন সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি বলেন, এমপি সেলিম ওসমান চাইলেই নিতাইগঞ্জ এলাকাটি স্ট্যান্ডমুক্ত রাখতে পারে। কারণ এসব ট্রাকের কারণে প্রচন্ড যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের নগর ভবনও অবরুদ্ধ হয়ে যায় যানজটের কারণে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেলিম ওসমান ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে দিনের বেলায় ট্রাক না রাখার নির্দেশনা দেন। দিনের বেলায় ট্রাক রাখতে না পারলে প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছেড়ে দেয়ারও কথা বলেন সেলিম ওসমান। পরে ৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এমপি সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উর্ধ্বতনরা। যাতে সিদ্ধান্ত হয় ১ আগষ্ট থেকে নিতাইগঞ্জের বোটখালের উপরে লোড আনলোড করবে ব্যবসায়ীরা। একটি ট্রাক লোড আনলোডে সর্বোচ্চ সময় পাবে সর্বোচ্চ ৩ ঘন্টা। মূল সড়কের উপর কোন ট্রাক থাকতে পারবেনা। যদি কেউ নির্দেশনা অমান্য করে দিনের বেলায় ট্রাক নিয়ে অবস্থান করে তাহলে তাকে জরিমানা ছাড়াও ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল দেয়া হবে। এদিকে দীর্ঘদিন নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ডটি একটি শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ডটি আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। বর্তমানে আগের মতোই নিতাইগঞ্জের প্রধান সড়কের উপরে পণ্যবাহী ট্রাকে লোড আনলোড চলছে। এছাড়া একাধিক সারি করে খালি ট্রাক পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। তবে আগে যেভাবে নিতাইগঞ্জের বোটখাল, ডাইলপট্টি ও নিমতলী মূল সড়কে অসংখ্য গাড়ি পার্কিং করে লোডআনলোড চলতো এবার ট্রাকস্ট্যান্ডের পরিধি আরো বেড়েছে। এখন নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড ছড়িয়ে পড়েছে ১৮নং ওয়ার্ডের সর্বত্র জুড়ে। নিমতলী ও ডাইলপট্টিতো রয়েছেই বর্তমানে শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন সড়কটি (এসজি রোড) ও শহীদ বাপ্পী সড়কটি মিনি ট্রাকস্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। সেখানে বর্তমানে অবাধে চাঁদাবাজি চলছে। উভয় সড়কেই কমপক্ষে ৩০টি ট্রাক পার্কিং করে রাখা হয়। লোড আনলোড নিয়ন্ত্রন ও চাঁদা আদায়ের জন্য কয়েকজন যুবক নিয়োজিত রয়েছেন যাদেরকে সকলেই স্থানীয় কাউন্সিলরের অনুগামী হিসেবেই চেনে। এই দু’টি সড়কে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০টি ট্রাক থেকে লোড আনলোড করা হচ্ছে। জানা গেছে, দিনের বেলায় বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে ট্রাক কাভার্ডভ্যান প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে কারণে দিনের বেলায় নারায়ণগঞ্জ শহরে ট্রাক কাভার্ডভ্যান প্রবেশ নিয়ন্ত্রনের জন্য শহরের খানপুরে মেট্রো সিনেমা হল মোড়ে প্রতিদিন পুলিশের কয়েকজন সদস্য নিয়োজিত থাকে। যার মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৪/৫ জন পুলিশ কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাদের দায়িত্ব হলো পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনাল থেকে যেসকল ট্রাক কাভার্ডভ্যান টোকেন নিয়ে আসবে তাদেরকেই সিরাজদ্দৌলা সড়ক দিয়ে প্রবেশ করার অনুমতি দিবে পুলিশ সদস্যরা। টোকেনের একটি অংশ ওই পুলিশ সদস্যরা নিজেদের কাছে রাখবে আর অপর অংশটি ট্রাক চালককে দিয়ে দিবে। এদিকে ট্রাকগুলো পঞ্চবটি ট্রাক ট্রাক টার্মিনাল থেকে রওয়ানা দিয়ে শহরের উপর দিয়ে নিতাইগঞ্জে যাওয়ার কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পুরাতন) সড়ক ও শহরের অভ্যন্তরে নবাব সলিমুল্লাহ সড়ক ও সিরাজদ্দৌলা সড়কের উপরে যানবাহনের চাপ যেমন পড়ছে তেমনি প্রায়শই সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। তবে পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনাল থেকে নিতাইগঞ্জ পাইকারী ব্যবসা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য কোন বিকল্প সড়ক নির্মিত হলে শহরের ভেতরে যানবাহনের চাপ যেমন কমতো তেমনি নগরবাসীও যানজটের কবল থেকে অনেকটাই মুক্তি পেতো। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ(এলজিইডি), স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনালটি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন হলেও ওই এলাকাটি এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন। এছাড়া সড়কগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ এবং এলজিইডি। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় যাতায়াতের রাস্তাগুলো আরো প্রশস্ত করা যেতে পারে। তবে সরকারের সবগুলো সংস্থা জোটবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিলেই বিকল্প সড়ক নির্মাণ সম্ভব হতে পারে। আর সেটা বাস্তবায়ন হলে চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত পুরাতন সড়ক এবং শহরের উপরে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ যেমন কমবে তেমনি নগরবাসীও অনেক উপকৃত হবে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *