আজ বৃহস্পতিবার | ৩ এপ্রিল ২০২৫ | ২০ চৈত্র ১৪৩১ | ৪ শাওয়াল ১৪৪৬ | বিকাল ৪:৩৬
শিরোনাম:
ঈদের ছুটিতে সোনারগাঁয়ে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়    ♦     আড়াইহাজারে পরিত্যক্ত অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার    ♦     সিদ্ধিরগঞ্জে ফার্নিচার মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড    ♦     নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে প্রথম জামাতটি হবে সকাল ৮ টায়    ♦     ঈদের ছুটিতে ২ দিনে ঢাকা ছেড়েছেন প্রায় ৪১ লাখ সিমধারী    ♦     ঈদ মোবারক    ♦     রূপগঞ্জের রিয়াজ বাহিনীর গুলিবিদ্ধ পথচারীর মৃত্যু    ♦     সৌদিআরবের সাথে মিল রেখে ফতুল্লায় ঈদ উদযাপন    ♦     আড়াইহাজারে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা    ♦     নারায়ণগঞ্জ শহরে বেপরোয়া পরিবহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান    ♦    

দলবাজি সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি!

ডান্ডিবার্তা | ০২ আগস্ট, ২০২৪ | ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

হাবিবুর রহমান বাদল
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ৫দিন ব্যাপী নারকীয় ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে গত জুলাই মাসের ১৮ থেকে ২০ তারিখ এই তিন দিন নারায়ণগঞ্জে যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে তা মনে করলেও আৎকে উঠতে হয়। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। তবে এমন অবস্থা দেখার ভাগ্য হয়নি। সাংবাদিকতার চার দশকেরও বেশী সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও ওয়ান ইলিভেনের আগে বিএনপির সরকার পতনের আগে যে আন্দোলন হয়েছিল তাও দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে এবারের কোটা বিরোধী অহিংস আন্দোলন যেভাবে সহিংস আন্দোলনে রূপ নিল তার পিছনে কি কারণ রয়েছে তার বের করবে বিভিন্ন তদন্ত কমিটি। তবে বাস্তবতা হলো এবারের আন্দোলনের সঠিক চিত্র কিংবা হতাহতের বর্ণনা কি আমরা দিতে পেরেছি? এর উত্তর আমার নিজের কাছেও নেই। দেশের সর্বত্র প্রতিটি সেক্টরে যেমন বিভাজন তেমনই আমাদের গণমাধ্যমে বিভাজনটা চোখে পড়ার মত মনে হয় আমার কাছে। এখানে পেশাজীবীদের চাইতে ভ’ইফোঁড় নামধারী এবং কার্ডধারী সাংবাদিকদের দাপটটাই যেন বেশী। গলাবাজি যে বেশী করছে, তার চেয়ারটাই সবচেয়ে বড়। এক কথায় দলবাজ সাংবাদিকদের কাছে পেশাজীবী সাংবাদিকরা এখন অনেকটাই অসহায়।
কোটা সংস্কারের ছাত্র আন্দোলনের সাথে দিন দিন বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেনী যোগ দিচ্ছে। এবারের আন্দোলনটা অনেকটাই ভিন্ন ধরনের। কোটার রাজনৈতিক অপব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ ছাত্র-তরুণদের মধ্যে ন্যায় অন্যায়ের বোধকে জাগ্রত করে তুলেছে। এর পিছনে বছরের পর বছর সর্ব ক্ষেত্রে অন্যায়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর সর্বত্র ঘুষ আর অনিয়মের কারনে একটি শ্রেনী আঙ্গুল ফুলে যেমন কলাগাছ বনে গেছে তেমনই আরেকটি শ্রেনী নিদ্দিষ্ট আয় দিয়ে মাস চালানোতো দূরের কথা মাসের যাওয়ার পরই আধপেটা খেয়ে চলতে হচ্ছে। আর এ অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষও দিন দিন ফুঁসে উঠছে। যার চিত্র আমরা দেখি ছাত্র আন্দোলনে মায়েরা ঘরে বসে না থেকে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। যাত্রবাড়ি থেকে শিমরাইল যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে তা ভাষায় বর্ণনা করার নয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার যদি মনে করে সবকিছু সামাল দেয়া হয়েছে তাহলে তা ভুল হবে। বিগত দেড় দশকে রাজনৈতিক দলের গলাবাজদের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও এক শ্রেনীর দলবাজ সাংবাদিক সৃষ্টি হয়েছে। এরা লুটপাট করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে চলছে। আর রাজধানীসহ দেশ ব্যাপী পেশাদার সাংবাদিকরা সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। একটি দুর্বৃত্তের দল ছাত্র আন্দোলনকে পূঁজি করে রাষ্ট্রিয় সম্পত্তি তথা অনেক বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছে। এই অপতৎপরতার সাথে জড়িত তাদেরকে সঠিক ভাবে চিহিৃত করে আইনের আওতায় আনা হউক। পাশাপাশি যে সকল প্রাণ হারিয়ে গেছে তাদের হারিয়ে অনেক পরিবার নি:স্ব হয়ে গেছে। যারা মৃত্যুবরণ করেছে কিংবা যাদেরকে বলা চলে হত্যা করা হয়েছে এদের হত্যাকারীদের চিহিৃত করে দৃষ্টান্তমূল শাস্তি না দিলে এ আন্দোলন থামবেনা বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। ছাত্র আন্দোলনে দিন দিন বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ সম্পৃক্ত হচ্ছে। বলা চলে বর্তমান ছাত্র আন্দোলনস গণআন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে যে শিশু কিশোরগুলি নিহত হয়েছে তারা যদি আমাদের হতো?
আমরা সংবাদকর্মীরা ঘটনাগুলো সরাসরি দেখেছি, আমরা পুলিশের গুলিবর্ষণও দেখেছি, আবার আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ইটপাটকেল বা লাঠিসোঁটা দিয়ে আক্রমণও করার দৃশ্যও দেখেছি। এসব দেখার ফলে শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, দেশের একজন নাগরিক হিসেবেও মানসিকভাবে আমি ভীষণ হতাশাগ্রস্ত। আমি দেখেছি যারা মারা গিয়েছে তাদের বেশিরভাগ কম বয়সী এবং নিরপরাধ। আমরা চাই না এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আর ঘটুক।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সহিংসতায় এখন পর্যন্ত কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন পক্ষের নানা বক্তব্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ১৫০ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিহতের সংখ্যা অন্তত ২৬৬ জন। অন্যদিকে একটি মানবাধিকার সংগঠনের ধারণা, নিহত ২৫০ জনের কম নয়। কোনো কোনোও পরিবার দাবি করেছে, তাদের স্বজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। আবার অনেকেই নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করছেন। নিহত এবং আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গুজবও রয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। আমরা কি বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি? বরং দলবাজির কাছে আমরা হেরে গেছি। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়েছে। এখানে মনে পড়ছে
কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা: মায়া-প্রপঞ্চ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে ছিলেন। যাঁরা সাংবাদিকতাকে নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ পেশা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য প্রবন্ধটি চোখ খুলে দেওয়ার মতো। সাংবাদিকদের ক্ষমতার সখ্য দেখে হাসান আজিজুল হকের প্রবন্ধের হীরকোজ্জ্বল শব্দরাশি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তিনি লিখেছেন, ‘সমাজে সর্বস্তরের মানুষ নির্লজ্জ আপস করছে, জীবিকার জন্য, চাকরির ভয়ে প্রতিমুহূর্ত মাথানত করে, আর সাংবাদিকরাই নির্ভীক, সৎ এবং সত্যনিষ্ঠ থাকবে, এ রকম দাবি অন্যায় আবদার ছাড়া আর কিছুই নয়।…নির্ভীক সাংবাদিকতা বিচ্ছিন্নভাবে চর্চার বিষয় নয়। সমাজ সংগঠনের গাঁটে গাঁটে দুর্নীতি, স্বজনতোষণ, কর্মহীনতা, হিংস্র দারিদ্র্য এবং তামসিক শোষণের ব্যবস্থা থাকলে…সাংবাদিকও স্বধর্মচ্যুত হয়ে…কোনো রকমে দিন গুজরানোর চেষ্টা করেন।’ অমোঘ উচ্চারণ। অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতা। কেবল জীবন-জীবিকার তাগিদে সাংবাদিকেরা স্বধর্মচ্যুত, এমনটি নয়। ক্ষমতার সঙ্গে সখ্যপ্রিয়তা সাংবাদিকদের স্বধর্মচ্যুত করে। সাংবাদিকেরা রাখঢাক না রেখে ক্ষমতা ও এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে তুলতে তৎপর হয়ে উঠছেন, যা রুগ্ন বাস্তবতা তৈরি করছে। ক্ষমতাপ্রীতি সাংবাদিকতায় একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিকেরা যদি ‘প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত’ থাকেন অথবা ‘গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন’ দেন, তবে ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার মধ্যে বিভেদরেখা টানা কঠিন হয়। সাংবাদিকতা হলো নির্মোহ বিশ্লেষণ, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ উপস্থাপনা। সাংবাদিকতা পেশার অভিমুখীনতা হলো কোনো বিষয় অনুপুঙ্খভাবে দেখা; সত্য যাচাই, সত্যকে কল্পকাহিনি থেকে আলাদা ও নির্মোহভাবে তা উপস্থাপন করা। সংবাদমাধ্যমের কাজ বিশ্লেষণাত্মক, যুক্তিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করা। কারণ, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন তথ্যসমৃদ্ধ জনসমাজ। একটি বিশ্লেষণাত্মক সমাজ গড়া না গেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে কোথা থেকে? ক্ষমতা ও শাসন চোখে চোখে রাখা সাংবাদিকতার প্রধান কাজ। কারণ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ব্যবহার ও অপব্যবহার এক জনস্বার্থমূলক বিষয়। অনেকের কাছে সাংবাদিকতা এখন একটি উপলক্ষমাত্র। বিত্তবৈভব, ক্ষমতা অবস্থান ধরে রাখার বিশেষ কৌশল। সমকালীন সাংবাদিকতার ক্ষয়-ক্ষরণ কারও অদেখা বা অজানা নয়? সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রশ্ন করার সক্ষমতা ও সাহস। ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেই একশ্রেণির সাংবাদিকের মধ্যে বিগলিত ভাব চলে আসে। সাফাই গান। অথবা এমন প্রশ্ন করেন, যার ভেতর প্রত্যাশিত উত্তর থাকে। সাংবাদিকতার ধারণা যথেষ্ট পোক্ত না হলে ক্ষমতার তাপ সাংবাদিকদের নির্বিষ করবেই। ক্ষমতাবানেরা যে ফাঁদ পেতেছেন, সাংবাদিকেরা তাতে ধরা দিচ্ছেন। সাংবাদিকতা এক নতুন ছদ্মাবরণ ধারণ করছে। পদ-পদবি, সমিতি সবকিছু সাংবাদিকতার আদলে, কিন্তু এর মাধ্যমে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। এ নকল আবহ আপাতদৃষ্টে বৈধ বলে মনে হয়। কারণ, এর সঙ্গে যুক্ত আছেন সাংবাদিক, সম্পাদক ও অধ্যাপক! এসব পরিচয় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, মুখগুলোও অচেনা নয়। এরা মূলত শাসকশ্রেণির বয়ানের ব্যাপারী। নিজেদের বিশেষ অনুসন্ধান নেই, নেই বিশ্লেষণ। এ কারণে ক্ষমতাঘনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হয়ে উঠছে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বৈধকরণের এক বিশেষ উপায়। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, যারা মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার চেষ্টা করছে, এই চক্র তাদের বিরুদ্ধে কারণে-অকারণে উঠেপড়ে লাগছে। সাংবাদিকদের মধ্যে গোষ্ঠীপ্রিয়তার নতুন বিন্যাস দেখা যাচ্ছে। এমবেডেড (অবরুদ্ধ) সাংবাদিকতা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না, জনতুষ্টিবাদী শাসনের ছায়ার নিচেও এমন সাংবাদিকতা হয়। একটি রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়নি, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা সীমিত, সেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো অলীক ধারণা নয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে না। সাংবাদিকতা মানুষকেন্দ্রিক একটি পেশা। যত দিন মানুষ আছে, তত দিন এ পেশার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব হলো পেশাটি পরিচ্ছন্ন রাখা, পরিশীলিত রাখা। স্বকীয় ধারায় এগিয়ে নেওয়া। ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাকে আমরা তথা কথিত জাতির বিবেকরা বিভিন্ন অযুহাতে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে আলাপকালে যেভাবে প্রকৃত ঘটনার ব্যখ্যা করে নিজের পদ পদবী অক্ষুন্ন রাখতে দলবাজি করে চলেছেন তা কোন অবস্থাতেই গণতন্ত্র বিকাশে কিংবা মূলধারার সংবাদকর্মীদের সন্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সহায়ত নয় বলে আমার বিশ^াস।




Your email address will not be published.

Comments are closed.


আজকের পত্রিকা
আজকের পত্রিকা
ফেসবুকে আমরা
পুরনো সংখ্যা
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
Copyright © Dundeebarta 2024
ডান্ডিবার্তা