রাজপথে নিজের অবস্থান জানান দিলেন শামীম ওসমান

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
নারায়ণঞ্জের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বড় জনসমাবেশ করে আসছেন ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান। বার বারই নারায়ণগঞ্জের রাজপথে নিজের অবস্থানের জানান নিয়ে আসছেন। বিশাল কর্মীবাহিনী থাকার কারণে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীরে রাজনীতি শামীম ওসমানের নিয়ন্ত্রনেই রয়েছে। হঠাৎই বিশাল বিশাল সমাবেশ করে আসছেন তিনি। তারই ধারাবাহিগতায় গতকাল শনিবার শহরের মিশনপাড়ার সলিমুল্লাহ সড়কে ‘রুখে দাঁড়াও স্বাধীনতা বিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে’ সমাবেশ করেছেন তিনি। দুপুর ২টা থেকেই সমাবেশস্থলে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যোগ দেয়া শুরু করেন। দুপুর তিনটার মধ্যেই সমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিনত হয়। সমাবেশে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমরা এখন চাইলে নারায়ণগঞ্জকে অবরুদ্ধ করে করতে পারি। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়ক চাইলেই অবরুদ্ধ করে দিতে পারি। আমরা অবরুদ্ধ করলে কারো ক্ষমতা নেই ঠেকাবে। সুতরাং আমাদের সঙ্গে খেলবেন না। কাকে খেলা শেখাবেন। আমরা তো অনেক ছোট বেলার খেলোয়াড়। যাদের এসএ আরএস সিএস পর্চার আওয়ামী লীগ তাদেরকে খাস বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর যারা খাস ছিলো তারা আজকে আওয়ামী লীগ। এসব যখন দেখি তখন কষ্ট লাগে। খুব কষ্ট লাগে।’ প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শুদ্ধি অভিযান চালান প্রশাসনের ভেতরে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ মানেই আগুন নিয়ে খেলা। সুতরাং খেলবেন না। পারবেন না। জিয়া পারে নাই, খালেদা জিয়া পারে নাই, এরশাদ পারে নাই। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ হলে কাউকে ছাড় দিব না। আমি সেই শেখ হাসিনার কর্মী।’ সমাবেশ ডাকার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আজকের সমাবেশ অন্য কোন সাবজেক্ট না। গত কোরবানীর ঈদে মাংস বিতরণের নামে একটি এনজিও রোহিঙ্গাদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা নামের এক নারী গিয়ে অনেক কিছু বলে আসছে। ড. কামাল, মির্জা ফখরুলরা বিদেশীদের জন্য মিটিং করছেন। মনে রাখতে হবে এ দেশের মানুষ বিদেশীরা। দেশের বাইরেও বাংলাদেশকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটা যখন শুনলাম তখনই এ সভার প্রস্তুতি নিলাম। যদি শেখ হাসিনা ডাকেন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে তাহলে আবারো একাত্তরের মত মাঠে নামতে হবে। এজন্যই মিটিং ডাকা।’ তিনি বলেন, ‘আমি জীবনেও নেতা হতে পারবো না কারণ আমার স্বার্থ আছে। আর মুজিবের সৈনিক কর্মীদের চাওয়া পাওয়া নাই নিঃস্বার্থবান।’ ‘১৯৭৯ সাল। নেত্রী তখনো দেশে ফিরে নাই। বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল নকশাকারী জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জে আসবেন খবর আসলো। আমরা চাষাঢ়াতে অবস্থান নিলাম। জিয়াউর রহমানের গাড়ি আটকে দিলাম। স্লোগান দিলাম খুনী জিয়া খুনী জিয়া। তখন বিএনপির জন্ম হয়নি। জাগো দলের হুমড়া চোমড়ারা আমাদের উপর এ্যাটাক করলো। ৭ জন ছেলে ছিলাম। কিন্তু কেউ দৌড় দিলাম না। আমরা সেই খেলোয়াড়।’ ‘বাবা মায়ের পর যদি কাউকে মানি কারো জন্য জীবন দিতে পারি তাহলে তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৭৫ এর পর যারা রাজনীতিতে এসেছি আমরা শেখ হাসিনাকে স্বপ্নের মা রাজনৈতিক মা মনে করি।’ ‘আমরা যখন চিৎকার করলাম তখন কেউ চিৎকার করে নাই। এ মিশনপাড়া এলাকাতেই একটি বাড়িতে জামায়াতের কার্যালয় ছিল। এ বাড়ি থেকেই আমার ছোট বোনকে টাকা দেওয়া হয়। এ বাড়িতেই গোলাম আজমরা এসে থাকতো। আমরাই প্রথম নারায়ণগঞ্জে গোলাম আজমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম। সাইনবোর্ড এলাকাতে সাইনবোর্ড সাটিয়ে দেওয়া হলো নারায়ণগঞ্জে গোলাম আজম কুকুরদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মজলিশের সূরার কমিটিতে আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া হলো। আমরা শুরু করেছিলাম সেটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীতেও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো। আমাকে শেখ হাসিনা ডেকে বলেছিল তোমাকে হত্যা করা হবে। বলেছিলাম সামনা সামনি যুদ্ধ হবে। কারণ ওরা আসবে ১ হাজার আর আমরা দুইজনই যথেষ্ট। কিন্ত বুঝতে পারি নাই কাপুরুষের মতো পেছন থেকে হামলা করবে। ১৬ জুন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা করা হলো। মারা হলো একে একে সবাইকে। তখন রক্তের উপর শোয়া ছিলাম। দেখেছি অনুভব করেছি রক্ত কত গরম।’ ‘ঘটনার পর আমার স্ত্রীকে ফোন করে বলা হয়েছিল মনে করিস না বেঁচে যাবে। ওকে আমার মারবো। আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। আমাদের মাতৃতুল্য নেত্রী বার বার ফোন করছিল। বলছিল দ্রুত নারায়ণগঞ্জ থেকে সরাতে। এক পর্যায়ে সাংবাদিকেরা বললো কিছু বলবেন। উত্তর দিলাম শেখ হাসিনাকে বাঁচান।’ ‘২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলো। আমার ভাইয়ের ফ্যাক্টরিতে হামলা করে ৩০০ গরুর বান কেটে দেওয়া হলো। রাজহাসের অর্ধেক গলা কাটা হলো। বাড়িতে গুলি হলো। আমার মা এক কাপড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু আমরা তো ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ নাই। কারণ আমরা স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া একেএম সামসুজ্জোহার ছেলে।’ ‘২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর আমি নারায়ণগঞ্জ এসেছিলাম। সেদিন লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। আমাকে তখন সদর থানার ওসি ও এএসপি জানালেন আমাকে নাকি মেরে ফেলা হবে। গ্রেপ্তার করা হবে। সে রাতেই সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে ঘেরাও করেছিল। অন্তত ৫ হাজার সমাগম। চাষাঢ়ায় হীরা মহলে প্রবেশ করলাম। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো। এলাকার সবাই চলে আসলো আমার জন্য। মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে লাখ মানুষ চলে আসলো। ১৭দিন আমি এলাকাতে ছিলাম। কেউ ঢুকতে পারে নাই।’ তিনি বলেন, ‘এ মিশনপাড়া এলাকাতেই একটি বাড়িতে জামায়াতের কার্যালয় ছিল। এ বাড়ি থেকেই আমার ছোট বোনকে টাকা দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে দেখলাম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। জামাতের নেতা আলী আহসান মুজাহিদের স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কার কার সম্পর্ক সেটা আছে। মুজাহিদ যখন ফাঁসির দড়ির সামনে তখন কে তার স্ত্রী পরিবারের লোকজনদের সনদ দিয়েছে। কে নামমাত্র মূল্যে আদর্শ স্কুলের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সময় হলে আবার নৌকার জন্য কাঁদবেন সেটা আর হবে না।’ এদিকে, শামীম ওসমানের সমাবেশকে কেন্দ্র করে কঠোর অবস্থানে ছিল পুলিশ। শহরের প্রতিটি পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি জলকামান ও সাজোঁয়া যানও দেখা গেছে।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *