খুন আর ধর্ষণে উৎকন্ঠায় না’গঞ্জবাসী

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
বেশ কয়েকমাসের শান্ত নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি ঘটনায় ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। খুন, ধর্ষণ ও ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটায় এতে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বেড়ে গেছে অধিবাসীদের মধ্যে। এরমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় নাটকিয়তার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কালাপাহাড়িয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ গজ দুরুত্বের মধ্যে গত সোমবার রাত ২ থেকে ৩টা পর্যন্ত কালাপাহাড়িয়া ইউপির রাধানগর বাজারের আলম মার্কেটের ওয়াজউদ্দিন প্লাজার নীচ তলাসহ পাশের একটি মার্কেটে পুলিশ পরিচয় দিয়ে শর্টগান ও পিস্তুল ঠেকিয়ে মারধর করে তিনটি স্বর্ণের দোকান ও একটি মোবাইলের দোকানে ডাকাতির করে প্রায় ৭০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে স্পিড বোর্ডে পালিয়ে যায় দুস্কৃতিকারীরা। খবর পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার আড়াইহাজার থানার ওসি নজরুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সার্কেল ‘গ’ অঞ্চল আনিস উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে সন্দেহভাজন কাউকে আটক করতে পারেনি। সংঘবদ্ধ চক্রটি উজ্জ্বল শিল্পালয় স্থাপনকৃত সিসি টিভি ক্যামেরা খুলে নিয়ে গেছে। ঘটনার পর থেকে পুরো বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আড়াইহাজারের সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা এলাকায় গত সোমবার রাতে একটি মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের দোকান থেকে পারভেজ নামে এক কিশোরের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। এঘটনায় ওই এলাকার আশপাশে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সোনারগাঁয়ে গার্মেন্টস কর্মী পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার, ফতুল্লায় হোসিয়ারী শ্রমিক ধর্ষণের শিকার। ফতুল্লার হাজীগঞ্জ বাজার এলাকায় মাহমুদুল হক বাবুল (৫১) নামে এক জেনারেটর ব্যবসায়ীকে এলোপাথাড়ি পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একটি চায়ের দোকন থেকে তুলে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করে বেনু মিয়ার ছেলে আলম, রাকিব, খালেক, পলাশসহ আরো কয়েকজন যুবক। শুধু তাই নয় হত্যার পর বাবুলের বাড়ির সামনে নিয়ে তার লাশ তারা। মারধরের পর বীরদর্পে আনন্দোল্লাস করে ঘাতকরা। নিহতের ছোট ভাইকেও বাড়ির সামনে মারধর করে তারা। এঘটনায় ওই এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত রোববার রাতে সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাও এলাকায় অফিস ছুটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে এক গার্মেন্টকর্মীকে রাতভর গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠে। ওই ঘটনায় ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে ওই এলাকায়। গত রোববার নাসিকের ১৯নং ওয়ার্ডের মদনগঞ্জ কাটপট্টি এলাকার শাওন মিয়ার ছেলে আবির হোসেনকে অপহরণের ঘটনা ঘটে। বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপন আদায়ের পর তাকে মুক্তি দেয় অপহরণকারীরা। এঘটনায় ওই এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর রাত ২টার দিকে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি টিম ইউনাইটেড এসোসিয়েশনের প্রাইভেট লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে জুয়া খেলার সামগ্রী ৩ বান্ডিল কার্ড ও বিশ হাজার নয় শত টাকাসহ ক্লাব সভাপতি শিল্পপতি তোফাজ্জল হোসেন তাপুসহ সাতজনকে আটক করে। পরে আদালত তাদের ২০০ টাকার মুচলেকায় জামিন দেন। গত ২ অক্টোবর ভোরে রূপগঞ্জে জামাল হোসেন মৃধা নামে এক কয়েল ব্যবসায়ীর বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি। পরে ওই বাড়ি থেকে সোয়া এক কোটি টাকা ও দুই হাজার পিস উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানের পর ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেন উদ্ধারকৃত টাকা গরু ও জায়গা বিক্রি এবং কয়েল তৈরির কাঁচামাল কেনার টাকা। জামাল মৃধা ওই এলাকার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক। আলোচিত প্রিয়াংকা হত্যা মামলার আসামীদের বিচারের দাবিতে এবং মাদক বিরোধী সমাবেশ করার কারণে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। গত ২ অক্টেবার রাত ১১টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইল এলাকায় মুনস্টার মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড ও ম্যাক্স ইলেক্ট্রো ইন্ড্রাষ্টিজে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিপুল সংখ্যক নকল প্রসাধনী ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য সামগ্রী জব্দ করে ডিবি পুলিশ। এসময় ৮জনকে আটক করা হয়। অভিযানের পরদিন ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক ধানমন্ডির বাসিন্দা হাজী বেলায়েত হোসেন এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ অভিযানটিকে প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান। তার দাবি সেখানে ১২ কোটে টাকার বেশি মালামাল ছিলোনা। অভিযানে বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়নি। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। অক্টোবর মাসের ২ ও ৩ তারিখে পুলিশের চালানো অভিযানগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একাধিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। আতঙ্ক আছে ব্যবসায়ীক সমাজেও। এই মাসের প্রথম দিনেই নগরীর কোক্রারিজের দোকানে কাজ করা শ্রমিক আজমীর ও তার বন্ধুকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তাদের ইয়াবাসেবনকারী হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া তার পরিবারের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা আদায় করা হয়। তবে টাকা দিয়েও পার পায়নি আজমীর। সন্তানকে ছাড়াতে আজমীরের মা স্বর্ণবন্ধক দিয়ে ১ লাখ টাকা জোগাড় করে দেয়ার পরও আজমীরকে ৩৪ ধারায় কোর্টে চালান দেয়া হয়। এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার তৈরি হয়। হঠাৎ করে নারায়ণগঞ্জে সপ্তাহব্যাপী এসব ঘটনায় চলতি মাসের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এবিষয়ে নাগরিক কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এড.এবি সিদ্দিকী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে যারা অপতৎরতা চালাচ্ছে তার জন্য দায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতো তাহলে এসব অভিযোগ উঠতোনা। এধরণের ঘটনাও ঘটতে পারেনা। যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এসব ঘটনা দিনের পর দিন কমে যেত।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা যে কোন ঘটনায় যথেষ্ট সময় দেয়না, যাচাই বাঁছাই করেনা। তারা যদি সচেতন, সক্রিয় ও দায়িত্ববান হতো তাহলে এধরণের ঘটনাগুলো কমে যেত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *