নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব পাবেন পরিচ্ছন্ন নেতারা

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত শব্দ হলো শুদ্ধি অভিযান। সারাদেশেই চলছে এই শুদ্ধি অভিযান। বিশেষ করে রাজধানী ও রাজধানী লগোয়া জেলাগুলোতেই এই শুদ্ধি অভিযানের হাওয়া প্রবল বেগে বইছে। এই অভিযানের শুরু করেছেন টানা তিন মেয়াদ ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সারাদেশে চলমান এই শুদ্ধি অভিযানের বেশি শিকার হচ্ছেন নিজ দলীয় নেতাকর্মীরাই। তারপরেও থামছে না এ অভিযান বরং দিন দিন এর মাত্রা বেড়েই চলছে। আওয়ামী লীগ চাচ্ছেন এই শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে দলকে পরিশুদ্ধ করতে। এ অভিযানে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের যে সকল নেতারা টিকে থাকতে পারবেন তারাই পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে পরিচিত হবেন এবং আগামী কমিটিগুলোতে তারাই স্থান পাবেন। যার সূত্র ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোতেও পরিচ্ছন্ন নেতারাই স্থান পাবেন বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেই সাথে তৃণমূল নেতাকর্মীদেরও চাহিদা থাকবে পরিচ্ছন্ন নেতাদের দলীয় পদ পদবীতে আনা। জানা যায়, সারাদেশে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন ভূমিকায় রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরও নেতাকর্মীদেরও ছাড় দিচ্ছেন তারা। সারাদেশেই শুরু করেছে শুদ্ধি অভিযান। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের অনেক রাঘব বোয়াল আইন-শৃংখলা বাহিনীর জালে আটকা পড়েছে। যার ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জেও দুইজন আলোচিত ব্যাক্তি আইন-শৃংখলা বাহিনীর জালে আটকা পড়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন জি কে শামীম, যিনি নিজেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতেন। অন্যজন হলেন সেলিম প্রধান, যিনি আগে বিএনপি করলেও বর্তমানে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। সেই সাথে এদের সাথে যারা জড়িত ছিলেন কিংবা তাদের উত্থানের পিছনে কাদের ভূমিকা রয়েছে তাদের নিয়েও অনেক আলাপ আলোচনা চলছে। এর আগে এই অভিযানের শুরু করা হয় সমালোচনার মুখে থাকা আওয়ামী লীগের ভ্যানগার্ড খ্যাত ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বহিস্ককার করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় চাঁদাবাজির অভিযোগে তাদেরকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সাথে আওয়ামী অন্যতম প্রধান সহযোগী সংঘঠন যুবলীগের কিছু নেতার কর্মকান্ডেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ছাত্রলীগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে তুলনা করে যুবলীগের কিছু নেতার উদ্দেশে বলেন, ‘এরা আরও খারাপ।’ তার এই ঘোষণার পর পরই পাল্টে যায় পুরো দেশের পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ অভিযানকে শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে শুরু হওয়া ‘শুদ্ধি অভিযান’ অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চলতেই থাকবে এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই এখন নাকি গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অদূর ভবিষ্যতে অভিযান পরিচালিত হবে। এদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটির সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পক্ষে পাঠানো চিঠিতে তিনি এই নির্দেশ দেন। দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। চিঠিতে দেশের সব জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনের আগেই সংগঠনের যে সব শাখা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, সেসব কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওই সভায়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। যার ধারবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন নেতারাই কমিটিতেই স্থান পাবেন। যাদের নামে কোন বিতর্ক কিংবা কোনো দোষ রয়েছে তাদেরকে পদায়ন করার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের ডিমোশন দিয়ে দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ও আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি দিতে চান প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই এবারের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে সেভাবেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। সূত্র বলছে, ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহাকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে বিলুপ্ত শহর আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সভাপতি ও সেক্রেটারী পদে ছিলেন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা। কমিটির মেয়াদ ছিল ২ বছর। কিন্তু পার হয়ে গেছে ৭ বছর। ফলে শুদ্ধি অভিযানের পর পরই মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আবদুল হাইকে সভাপতি, সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহ সভাপতি এবং আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট জেলা আওয়ামীলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ১৩ মাস পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ৭৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। ইতোমধ্যে এই কমিটিরও প্রায় ৩ বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের পদে থাকা অনেক নেতাই ইতোমধ্যে নানা বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন। যাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে নানা সামালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দলকে শুদ্ধ করার লক্ষ্যে জেলাতেও নতুন কমিটি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মূল দলের পড়ে তাদের প্রধান সহযোগী সংগঠন হচ্ছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। যার সূত্র ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবলীগ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের আগামী কমিটিতে পরিচ্ছন্ন নেতারা স্থান পাবেন। জানা যায়, ২০০৫ সালে বিএনপি জোট সরকার আমলে অনেকটা বেকায়দায় নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জেলা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন আবদুল কাদির ও সাধারণ সম্পাদক হন অ্যাডভোকেট আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল। সম্মেলনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল। যারা বর্তমানে মূল দরে ঠাঁই নিয়েছেন। ফলে জেলা যুবলীগ চলছে অভিভাবহীন। শহর যুবলীগের সভাপতি পদে রয়েছেন শাহাদাত হোসেন ভূইয়া সাজনু ও সেক্রেটারি পদে রয়েছেন আলী আহমেদ রেজা উজ্জল। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সভাপতি ও সেক্রেটারি পৃথকভাবে রাজনীতি শুরু করেন। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জে সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলেও এখনও মহানগর যুবলীগের কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে বর্তমান সময়ে যুবলীগের নেতাকর্মীদের প্রধান দাবীতে পরিণত হয়েছে জেলা ও মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটিতে আসা। যার সূত্র ধরে এই নতুন কমিটিতেও পরিচ্ছন্ন নেতারা স্থান পাবেন। একই সাথে চলতি বছরের গত ২৮ জুলাই তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন। এর আগে গত বছরের ১০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদনের কথা জানানো হয়। এতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে আজিজুর রহমান আজিজ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আশরাফুল ইসমাইল রাফেলকে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং মহানগর ছাত্রলীগের হিসেবে হাবিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হাসনাত রহমান বিন্দুকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *