দশ বছরে রাজনীতির উলটপালট!

ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
১০ বছরের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থীদের সঙ্গে ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের ফলাফলে ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। ১০ বছর আগে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের ৫ জন প্রার্থী যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল সেখানে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষের ৫জন প্রার্থীই পরাজিত হয়েছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রূপগঞ্জ আসনে গোলাম দস্তগীর গাজী নৌকা প্রতীকে পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৫৯ ভোট। অপরদিকে কাজী মনিরুজ্জামান মনির ধানের শীষে পেয়েছিলেন ৯৪ হাজার ৭২৬ ভোট। তাদের ভোটের পার্থক্য ছিল ৪৬ হাজার ৯৩৩ ভোট। ১০ বছর পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারো তারা মুখোমুখি হয়েছিলেন। অথচ তাদের ভোটের পার্থক্য ছিল ২ লাখেরও বেশী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রূপগঞ্জ আসনে নৌকা প্রতীকে ১২৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী পেয়েছেন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী কাজী মনিরুজ্জামান মনির পেয়েছেন ২১ হাজার ৪৮২ ভোট। অর্থাৎ বর্তমান এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৬ ভোট বেশী পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে বছর বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোট বর্জন করেছিল সেই নির্বাচনে এমপি গাজী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি নির্বাচন বর্জনকারী তালা প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামীলীগ নেতা ডা. শওকত আলী পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৬৯৮ ভোট। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আড়াইহাজার আসনে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের নজরুল ইসলাম বাবু পেয়েছিলেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ ভোট। অপরদিকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের বদরুজ্জামান খসরু পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৬৭৫ ভোট। অর্থাৎ ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী পরাজিত হয়েছিলেন মাত্র ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজরুল ইসলাম বাবু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আড়াইহাজার আসনে ১১৩ ভোটকেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান এমপি নজরুল ইসলাম বাবু ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অপরদিকে ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ পেয়েছেন ৫ হাজার ১৫২ ভোট। অর্থাৎ নজরুল ইসলাম বাবু জয়ী হয়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার ৯৩০ ভোটের ব্যবধানে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁ আসনে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়েছিলেন। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের অধ্যাপক রেজাউল করিম পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪ হাজার ২৪২ ভোট। অর্থাৎ কায়সার জয়ী হয়েছিলেন ৮৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ আবারো চলে যায় ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের সঙ্গে। ওই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সোনারগাঁ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সোনারগাঁ আসনে ১১৮টি ভোটকেন্দ্রে লাঙ্গল প্রতীকে মহাজোটের মনোনীত জাতীয় পার্টি দলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অপরদিকে ধানের শীষের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজাহারুল ইসলাম মান্নান পেয়েছেন ১৮ হাজার ৪৭ ভোট। অর্থাৎ লিয়াকত হোসেন খোকা বিজয়ী হয়েছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৮ ভোটের ব্যবধানে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফতুল্লা আসনে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের সারাহ বেগম কবরী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫১ ভোট। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের মোঃ শাহআলম পেয়েছিলেন ১,৩৭,৮৩৪ ভোট। অর্থাৎ বিএনপির শাহআলম মাত্র ১ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে পুনরায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা যুক্ত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ দলীয় শামীম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হন। এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ২১৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ১৩৬ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। অপরদিকে ধানের শীষ পেয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতী মনির হোসেন কাসেমী পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৫৮২ ভোট। অর্থাৎ শামীম ওসমান ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদর ও বন্দর আসনে মহাজোটের লাঙ্গল প্রতীকের নাসিম ওসমান ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের অ্যাডভোকেট আবুল কালাম পেয়েছিলেন ১লাখ ২৬ হাজার ৭৩৬ ভোট। অর্থাৎ ওই নির্বাচনে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম মাত্র ৪৭ হাজার ৬১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাসিম ওসমান বিনা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হন। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল নাসিম ওসমান ইন্তেকাল করলে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত উপ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছোট ভাই বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান। ওই উপ নির্বাচন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামীলীগ দলীয় সাবেক এমপি এস এম আকরাম নির্বাচন করলেও মহাজোট ইস্যুতে আওয়ামীলীগ কোন প্রার্থী দেয়নি। ওই নির্বাচনে সেলিম ওসমান পেয়েছিলেন ৮২ হাজার ৮৫৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরাম পেয়েছিলেন ৬৬ হাজার ১১৪ ভোট। অর্থাৎ ওই উপ নির্বাচনে এস এম আকরাম পরাজিত হয়েছিলেন ১৬ হাজার ৭৪২ ভোট। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে ১৭১ ভোটকেন্দ্রের লাঙ্গল প্রতীকের মহাজোট মনোনীত জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান পেয়েছেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা সাবেক এমপি এস এম আকরাম পেয়েছেন ৫২ হাজার ৩৫২ ভোট। অর্থাৎ সেলিম ওসমান জয়ী হয়েছেন ২ লাখ ২৭ হাজার ১৯৩ ভোটের ব্যবধানে। উল্লেখ্য নারায়ণগঞ্জের ৫টি সংসদীয় আসনেই বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্রেই বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল, আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা, জাল ভোট প্রদান, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা ও হুমকী প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগন্য। আগের রাতেই অধিকাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে রাখার অভিযোগ করেছেন বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীরা। আড়াইহাজারে এক পোলিং এজেন্টকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে আগের রাতেই ৪৫ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারা, পোলিং এজেন্ট বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল ও প্রার্থীকে অবরুদ্ধের অভিযোগে ধানের শীষের এক প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। অপর দুইজন প্রার্থী পুন:নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

About ডান্ডিবার্তা

View all posts by ডান্ডিবার্তা →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *